Friday, April 17, 2020

টেলিমেডিসিনে দৃষ্টান্ত ‘পটুয়াখালীবাসীর ডাক্তার’

টেলিমেডিসিনে দৃষ্টান্ত ‘পটুয়াখালীবাসীর ডাক্তার’
বৈশ্বিক মহামারি কোভিড-১৯ বা নভেল করোনা ভাইরাসের আক্রমণে সারা বিশ্ব যখন অস্থির, উন্নত বিশ্বও নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন থেকেই সারা বিশ্বেই স্বাভাবিক স্বাস্থ্য সেবা মুখ থুবড়ে পড়েছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিতে বিশ্ব ব্যবস্থা যতটা অস্থির, ঠিক ততটাই অবহেলা বা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে স্বাভাবিক চিকিৎসা ব্যবস্থায়।
২০২০ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশে প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী সনাক্ত হয়। ভয়াবহ ছোঁয়াচে এই রোগ সনাক্তের সঙ্গে সঙ্গেই দেখা দেয় মারাত্মক অব্যবস্থাপনা। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামাদির (পিপিই) অভাবে চিকিৎসকরা রোগীদের সামনে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। বন্ধ হয়ে যায় খ্যাতনামা ক্লিনিক ও হাসপাতাল। চরম হতাশা সৃষ্টি হয় বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবায়। স্থবিরতা নেমে আসে চিকিৎসা ব্যবস্থায়।
এমন বাস্তবতায় প্রতিদিন হাজারো রোগী স্বাভাবিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। স্বাভাবিক চিকিৎসা নিতে রোগীরা হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ঘুরছিল। তখনই সাগর পাড়ের জেলা পটুয়াখালীর তথ্যপ্রযুক্তিতে শানিত কয়েক জন উদ্যোক্তা ও চিকিৎসক নিজ জেলার মানুষদের রক্ষা করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে “পটুয়াখালীবাসীর ডাক্তার” নামে একটা টেলিমেডিকেল টিম তৈরি করে।
পটুয়াখালী জেলার নাগরিকরা এই গ্রুপের সদস্য হয়ে টেলিমেডিসিন সেবা পাচ্ছেন। গ্রুপের পক্ষ থেকে জেলায় জন্ম নেয়া খ্যাতনামা চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। চিকিৎসকরা সবাই এক সঙ্গে হ্যাঁ বলেছেন নিজ জেলার চিকিৎসা প্রার্থীদের সহায়তায়। চিকিৎসকদের তালিকায় দেশের নামকরা হাসপাতালের বিভাগীয় প্রধান থেকে সদ্য পাশ করা নবীন চিকিৎসকও আছেন।
আছেন হৃদরোগ, কিডনি, লিভার, চর্ম ও যৌন রোগে বিশেষজ্ঞ। দন্তরোগ, ফিজিক্যাল মেডিসিন এবং থেরাপি দেয়ার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও আছেন বেশ কয়েক জন। বিখ্যাত কয়েকজন গাইনী ও শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ আছেন এই তালিকায়। গ্রুপে ঢুকলেই চোখে পড়বে চিকিৎসকদের একটি তালিকা। সেখানে চিকিৎসকের নাম, যে বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, মোবাইল নম্বর এবং কোন সময়ে তারা টেলিমেডিসিন পদ্ধতিতে চিকিৎসা দিবেন বিস্তারিত দেয়া হয়েছে।
মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে বিনামূল্যে মোবাইল ফোনে চিকিৎসা নিচ্ছেন পটুয়াখালী জেলার সাধারণ রোগীরা। একজন রোগী চিকিৎসকের মোবাইল ফোনে কল করেই পাচ্ছেন ডাক্তারের সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান আলাপের সুযোগ। ম্যাসেঞ্জারে রিপোর্ট দেখে পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা, দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় পরামর্শ।
বিনামূল্যে মোবাইল ফোনে চিকিৎসা পেয়ে অনেকেই আবার গ্রুপের ওয়ালে আনন্দময় স্মৃতি তুলে ধরছেন। কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছেন নাম উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের। সবাই মিলে, অভিনন্দন জানাচ্ছেন চিকিৎসকদের। শুধু চিকিৎসা নয়, একটা প্রাণের মেলাও সৃষ্টি হয়েছে “পটুয়াখালীবাসীর ডাক্তার” নামে টেলিমেডিসিন গ্রুপে। এমন আয়োজনে এখন প্রতিদিনই অনেক তরুণ ডাক্তার নিজের নাম ও মোবাইল নম্বর উল্লেখ করে পোষ্ট দিয়ে চিকিৎসা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করছেন।
প্রতিদিনই স্বেচ্ছায় অনেক চিকিৎসক যুক্ত হচ্ছেন গ্রুপে। পটুয়াখালীতে কর্মরত অন্য জেলার চিকিৎসকরাও স্বেচ্ছায় যুক্ত হয়েছেন পটুয়াখালীবাসীর ডাক্তার গ্রুপে। পটুয়াখালীবাসীর ডাক্তার গ্রুপের অন্যতম উদ্যোক্তা সুমন জাহিদ অভিভূত হয়ে জানান, ইতিমধ্যেই গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ৬ হাজার ছাড়িয়েছে। আর চিকিৎসকের সংখ্যা শতাধিক। তিনি বলেন, দ্বিতীয় ফেইজে গ্রাম-গঞ্জের হাট-বাজারে পোষ্টার ও বিলবোর্ড এবং হ্যান্ড বিল বিতরণের মাধ্যমে চিকিৎসকদের মোবাইল নম্বর ছড়িয়ে দেয়া হবে। আর তৃতীয় ফেইজে জেলার ক্যামিস্ট-ড্রাগিস্ট ও ওষুধ ব্যবসায়ীরা হতদরিদ্রদের বিনামূল্যে ওষুধ দিয়ে কিভাবে সহায়তা করতে পারেন সে ব্যাপারে কাজ করবেন তারা।
ডা. ওয়াহিদ শামীম জানান, ৮০ ভাগ চিকিৎসক স্বেচ্ছায় গ্রুপে এড হয়ে তাদের মোবাইল নম্বর দিয়ে চিকিৎসা দিতে আগ্রহ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণের বিপর্যয় থেকেই পটুয়াখালীবাসীর আড্ডা গ্রুপটি তৈরি হয়েছে। কিন্তু করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও এই টেলিমেডিসিন গ্রুপটি থাকবে। তখনো চিকিৎসকদের সহায়তা পাবেন সবাই। আবার সবাইকে সচেতন করতে গ্রুপে নিত্য নতুন হেলথ টিপস দিতে পারবেন ডাক্তাররা।
প্রখ্যাত গাইনী বিশেষজ্ঞ ডা. রোম্মানা সায়েলা নুর রাখী জানান, সব সময়ই রোগীদের পাশে ছিলাম, এখনো আছি। পটুয়াখালীবাসীর ডাক্তার গ্রুপটি জেলার মানুষকে বর্তমান বাস্তবতায় ঐক্যবদ্ধ করেছে। অন্যরাও এই গ্রুপটি থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজ নিজ জেলার মানুষের উপকার করতে পারেন। তিনি বলেন, জেলার সাধারণ মানুষের সঙ্গে চিকিৎসকদের একটা নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে, যা আগামী দিনে আরও শক্তিশালী হবে।
লেখক: খন্দকার দেলোয়ার জালালী, সাংবাদিক ও জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যানের ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি

No comments:

Post a Comment