করোনার কারণে যান চলাচল কম। রাজধানী এখন শব্দদূষণ মুক্ত মামুনুর রশিদ
পাখির ডাকে কবে ঘুম ভাঙত নগরবাসীর, এমন স্মৃতি মনে করাই দুস্কর। যানবাহন আর
নির্মাণ সামগ্রীর বিকট শব্দে বরং ঘুমানোই ছিল মুশকিল। করোনা পরিস্থিতিতে
সবকিছুই থমকে আছে। শহর থেকে গ্রামজুড়ে এক নিঃসীম নিস্তব্ধতা। কৃত্রিম
কোলাহল নেই। ভোর হতেই কানে সুখের মতো বাজে পাখির কলকাকলি। আজ আন্তর্জাতিক শব্দ সচেতনতা দিবস। প্রতিবছর এপ্রিলের শেষ বুধবার দিবসটি পালিত হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এবার নেই কোনো আয়োজন। তবে দিনরাত কর্কশ শব্দে অতিষ্ঠ মানুষের জন্য দিনটি এলো এক স্বস্তির পরিবেশে।
দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। এরপর বদলে যেতে থাকে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের দৃশ্যপট। ২৬ মার্চ সাধারণ ছুটি ঘোষণা হলে একপ্রকার স্থবির হয়ে যায় গোটা দেশ। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে শব্দের মাত্রা নেমে আসে আদর্শ অবস্থায়। কিছুদিন আগেও যেখানে আদর্শমাত্রার দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ ছিল, সেসব এলাকায় অভাবনীয় পরিবর্তন দেখা যায় এপ্রিলের শুরু থেকে।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) নিয়মিতভাবে ঢাকার শব্দের মান পর্যবেক্ষণ করে। ১ এপ্রিল ধানমন্ডিতে তারা ৪০ ডেসিবেল শব্দ পায়। যেখানে কিছুদিন আগেও ছিল ৮১ ডেসিবেল। পরিবেশ অধিদপ্তরের বিধিমালা অনুযায়ী, ধানমন্ডির ওই জায়গায় দিনের বেলায় শব্দের আদর্শ মাত্রা ৫৫ ডেসিবেল। একইভাবে আরও কয়েকটি জায়গায় শব্দের মাত্রা পরিমাপ করে আদর্শমাত্রার চেয়ে কম, অর্থাৎ ভালোর চেয়েও ভালো অবস্থায় পাওয়া গেছে। এর আগে গত ডিসেম্বরে ঢাকার ৭০টি এলাকার জরিপে দেখা যায়, নীরব, আবাসিক ও মিশ্র এলাকার ক্ষেত্রে শব্দের মাত্রা ১০০ ভাগ আদর্শ মানের ওপরে ছিল।
ক্যাপস পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার
সমকালকে জানান, সাধারণত তারা গাড়ির ইঞ্জিন ও হর্ন এবং নির্মাণ কাজের শব্দই বেশি শুনতে পেতেন। লকডাউন শুরু হওয়ার পর পাখির ডাক বেশি শুনতে পাচ্ছেন। শহরে থেকেও যে পাখির এমন মিষ্টি মধুর গান শোনা যায়, তা এই শহরের মানুষ ভুলেই গিয়েছিল।
তিনি বলেন, এই অবস্থা বেশিদিন থাকবে না। আবার হয়তো শব্দ আগের জায়গায় ফিরে যাবে। তবে এই পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করা উচিত। শব্দদূষণের উৎসগুলো বন্ধ করতে হবে। হাইড্রোলিক হর্ন আমদানি বন্ধ ও শাস্তি জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি আবাসিক এলাকাকে বাণিজ্যিক এলাকায় পরিণত না করার পরামর্শ দেন তিনি।
নিসর্গী বিপ্রদাশ বড়ুয়া সমকালকে বলেন, এমন পরিবেশ এর আগে আর আসেনি। এখন ঘরের ভেতরে শুয়ে-বসে থাকলেও পাখির ডাক স্পষ্ট শোনা যায়। আগে গাছের তলায় বসেও সেটি সম্ভব ছিল না। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকারকে আরও উদ্যোগী হতে হবে।
দূষণ রোধে দেবদারু : করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেলে আবার যানবাহন চলবে, খুলবে কলকারখানা। ফলে শব্দদূষণ প্রতিরোধের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেবদারু প্রজাতির গাছ কৃত্রিম শব্দ শুষে নিতে পারে বলে সম্প্রতি এক গবেষণায় প্রমাণ মিলেছে। শহরে বেশি বেশি দেবদারু গাছ লাগানো যেতে পারে। এটা শহরের সৌন্দর্য বর্ধনেও ভূমিকা রাখবে।
অ্যাপ্লায়েড অ্যাকোয়াস্টিক জার্নালে প্রকাশিত ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডনের গবেষণা বলছে, তীব্র থেকে তীব্রতর শব্দও বাধা পড়ে গাছের পাতার আড়ালে। দেবদারু প্রজাতির ১৩টি গাছের শব্দ শুষে নেওয়ার ক্ষমতা সর্বাধিক। গাছ সাইলেন্সারের কাজ করতে পারে। শহরাঞ্চলে যেসব গাছ দিব্যি বংশবিস্তার করতে পারে, সেই দেবদারু কিংবা পাইন, চেরি, পপলার গাছের এই ক্ষমতা আছে।
No comments:
Post a Comment