Friday, April 24, 2020

ত্রাণের লাইনে আনন্দ, বেদনা

অনলাইন ২৪ এপ্রিল ২০২০, শুক্রবার, ১২:০৫ | সর্বশেষ আপডেট: ১২:১৯

ত্রাণ নিতে লম্বা লাইন। সকাল নয়টা থেকে মানুষ এসে জড়ো হয়েছেন। ৬০ নং ওয়ার্ড কমিশনার আনোয়ার মজুমদারের বাড়ির সামনের রাস্তায় দেয়া হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর উপহার। প্রত্যেকে পাচ্ছেন ৫ কেজি চাল আর এক কেজি আলু। রাস্তার একপাশে পুরুষ অন্যপাশে মহিলা। হ্যান্ড মাইকে ঘোষনা দেয়া হচ্ছে দূরত্ব বজায় রাখার। ত্রাণ নিতে আসা সবার হাতে টোকেন। দুইজন লিস্টর সঙ্গে টোকেন পরীক্ষা করে পাঠাচ্ছেন।
পরে প্যাকেট করে রাখা চাল আর আলু তুলে দেয়া হচ্ছে টোকেনধারীর হাতে। ত্রাণ দেয়ার এ কাজ তদারকি করছেন কমিশনারের ভাই নুরু মজুমদার, বশির উল্লাহ মজুমদার, স্থানীয় মুরুব্বী শাহজাহান মিয়া,
জাহাগীর আলম, শিমুল, মহসিন, মোসলেহ উদ্দিন,  মামুন হোসেন, সামসুল আলম, মারুফ হোসেন, শের আলম, নিজাম ইদ্দিন, মিনহাজ উদ্দিন, আক্তারুজ্জামান টিপু।

নুরু মজুমদার জানান, আজ এক হাজার মানুষের হাতে প্রধানমন্ত্রীর উপহার তুলে দেয়া হবে। এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। দুই দিন পরপর এক হাজার মানুষের হাতে আমরা ত্রাণ তুলে দিবো। ৬০ নং ওয়ার্ডের প্রতিটি মহল্লায় এভাবে দেয়া হচ্ছে। এখানে দেয়া হচ্ছে শুধু জনতাবাগ এলাকার লোকজনকে। ১২৭৩ নাম্বার টোকেনধারী মোঃ বাছির প্রধানমন্ত্রীর উপহার হাতে পেয়ে মহাখুশি। তিনি বলেন, গতকাল সারাদিন না খেয়ে কাটিয়েছে। এ উপহার নিয়ে বাসায় দিলে চুলায় আগুন জ্বলবে। ১২৮০ নাম্বার টোকেন নিয়ে সোনিয়া আক্তার এগিয়ে যান লিস্ট নিয়ে বসা টেবিলের কাছে। টোকেন পরীক্ষা করে টিপসই নিয়ে তাকে দেয়া হয় ত্রাণ। সোনিয়ার মুখে আনন্দের ঝিলিক। বলেন, জীবনে ভাবিনি এভাবে ত্রাণ নিতে হবে। করোনা আমার সংসার তছনছ করে দিয়েছে। এ ত্রাণ আমার কাছে মহামূল্যবান সম্পদ। ওদিকে এখানে অনেকেই টোকেন ছাড়া ত্রাণ নিতে এসেছেন।


কেউ কেউ কান্নাকাটি করছেন। ত্রাণের জন্য অনুনয় বিনয় করছেন। তাদের বলা হচ্ছে বিকালে কমিশনার অফিস থেকে টোকেন সংগ্রহ করতে। বিষন্ন মনে তারা ফিরে যাচ্ছেন। লাইনে শিশু সন্তান কোলে দাড়িয়ে আছেন ১২৭৬ টোকেনধারী মানছুরা আক্তার। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন এক ঘন্টা লাইনে দাড়িয়ে। লাইন এগুচ্ছেই না। খুব কস্ট হচ্ছে। এ ত্রাণ নিয়ে গেলে রান্না করব। তারপর সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেবো।
সকাল ১০টা। শনিরআখড়া বাস স্ট্যান্ড। তিন, চারটি রিকশা দাড়ানো যাত্রীর অপেক্ষায়। কবির নামে এক রিকশা চালক বলেন, নয়টা থেকে বসে আছি। একজন যাত্রীও পাইনি। শনিরআখড়া বাস স্ট্যান্ড থেকে উল্টো পথে রায়েরবাগ চলাচল করেন কবির।  আবার রায়েরবাগ থেকে যাত্রী নিয়ে শনিরআখড়ায় আসেন। পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে তিনি রিকশা চালান মহাসড়কে। বলেন, এরমধ্যে পুলিশের পিটুনিও খেয়েছি। পিঠে এখনও দাগ স্পষ্ট। তারপরও রাস্তায় নামি পেটের জন্য। এরই মধ্যে এক লোক জানতে চাইলেন সায়েদাবাদ যাবে কিনা। কবিরের উত্তর না যাবোনা। লোকটি চলে গেলেন। কবিরের কাছে প্রশ্ন গেলেননা কেন? তার উত্তর, যেতে পারতাম। টাকাও বেশি পেতাম। কিন্তু যাত্রাবাড়ী গেলেই পুলিশ আটকে দেবে। গাড়িও জব্দ করে নিতে পারে। কবির বলেন, ঘরে স্ত্রী, সন্তান বসে আছে। আমি কিছু নিয়ে গেলে খাবে। ততক্ষণ উপুষ থাকবে। কবির থাকেন মাতুয়াইলে।

কবিরের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই মধ্যবয়সী একজন লোক মহাসড়ক দিয়ে হেটে যাচ্ছেন রায়েরবাগের দিকে। কবির এগিয়ে যান। বলেন, স্যার আমার রিকশায় চলেন। ভাড়া যা মনে চায় দিয়েন। মধ্যবয়সী লোকটি বললেন, আমিতো হেটে যাব। রিকশা চালক কবির বলেন আজ একটাকাও এখন পর্যন্ত আয় করতে পারিনি। লোকটির দয়া হলো। রিকশায় চড়ে বসলেন। কবিরের রিকশার চাকা ঘুরতে লাগল। একসময় দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল রিকশাটি। বেলা এগারটার কিছু পর জোড়খাম্বা গলিতে ঢুকতেই ডাক- আঙ্কেল খেজুর নিয়ে যান। আঙ্কেল নেন না। ওরা দুই ভাই সাকিব ও রাকিব। দুজনই কলেজে পড়েন। বাবা নিউমার্কেটের এক দোকানে কাজ করতেন। সবকিছু বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি বেকার হয়ে পড়েন। তারা দুজনেও টিউশনি করতেন। সেটাও এখন বন্ধ। বন্ধের মধ্যে এতদিন কোনরকমে সংসার চালিয়ে নিয়েছে। এখন নিরুপায় হয়ে দুই ভাই মিলে খেজুর বিক্রিতে নেমছেন। স্মার্ট ও বিনয়ী দুই ভাইয়ের ব্যাবহারে মুগ্ধ হয়ে অনেকেই কিনছেন খেজুর। শনিরআখড়ায় দেখা মাসুদ নামের এক লোকের সঙ্গে। তিনি বিভিন্ন কোম্পানীর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে মহাসড়কের পাশের ভবনগুলোতে কোম্পানীর বিজ্ঞাপনের ডিজাইন করেন। তার কয়েকজন কর্মচারীও আছেন। বলেন, যেদিন ছুটি ঘোষণা করা হয় সেদিনও নোয়াখালীতে কাজ করছিলাম। খবর পেয়ে সবকিছু ফেলে রেখে ঢাকায় চলে আসি। তিনি বলেন, আমাদের কাজটা দিনমজুরের মতো। কাজ করি। কোম্পানী থেকে বিল পেয়ে কর্মচারীদের দিন হিসাব করে টাকা দিয়ে দেই। এখন সবকিছু বন্ধ। আমাদের ইনকামও বন্ধ। এমন হাজার হাজার লোক এ পেশায় জড়িত। যাদের অনেকের ঘরে এখন চুলা জ্বলছেনা। ক্ষুধার জ্বালায় অনেকেই ত্রাণের জন্য ছুটছেন। আমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। ক্ষুধা আর করোনা আমাদের পিষ্ট করে মারবে। অজানা শঙ্কায় দিন পার করছি। কদমতলী থানার মদিনাবাগ এলাকায় মানুষের বাড়িতে ছুটা কাজ করে ভালই আয় করতেন সাফিয়া। করোনা থাবা মেলার পর একদিনেই সব মালিকরা তাকে মানা করে দেন কাজে না আসতে। সাফিয়া বলেন, আমরা ঘরে গেলে নাকি করোনা নিয়ে যাবো। আজ এক মাস ধরে কাজ নেই। দুই সন্তান আর মাকে নিয়ে কোন রকমে একটি রুমে থাকি। কদিন একনাগারে জাউ খাচ্ছি। বাজার করার পয়সা নেই। বেশি করে পানিতে এক পট চাল দিয়ে চুলায় বসিয়ে দেই। এভাবেই চলছে। জানিনা সামনে কি হবে।
জনতাবাগের এক ফ্ল্যাট মালিক জাহাঙ্গীর আলমের কাছে ত্রাণের লিস্টে নাম উঠানোর জন্য এসেছেন জামাল নামের এক দিনমজুর। তার বাড়ি ভোলার চরফ্যাশনে। বলেন, ঘরে খাবার নেই। কস্টে দিন কাটছে। জাহাঙ্গীর আলম একজনকে ফোন করে জামালের নাম লিস্টে রাখার অনুরোধ করেন। জামালকে ওই লোকের কাছে পাঠান। জামালের মুখে হাসি ফুটে উঠে। যেন রাজ্য জয় করেছেন তিনি। কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিদায় নেন জামাল। জাহাঙ্গীর আলম বলেন, প্রতিদিন এমন কত লোক যে আসে ইয়াত্তা নেই। যতটুকু সম্ভব সাহায্য করার চেষ্টা করি। নিজে যদি পারতাম দিতাম। আল্লাহ সেই তৌফিক দেননি। তিনি বলেন, এসব দরিদ্র মানুষকে দেখলে নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। সামনের দিনগুলো হয়ত আরও কঠিন হবে।

No comments:

Post a Comment