সাভারে গতকাল কারখানামুখী শ্রমিকরা -বাংলাদেশ প্রতিদিন
সাভার প্রতিনিধি জানান, বৃষ্টির মধ্যেই ঢাকায় ফিরছেন পোশাক শ্রমিকরা। তবে রাজবাড়ী, কুষ্টিয়া, বরিশাল, ফরিদপুর, পাবনা, টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ থেকে শ্রমিকরা দলে দলে ঢাকায় ফেরার চেষ্টা করলেও পুলিশি বাধার মুখে পড়েন তারা। শনিবার রাত ১১টার পর ময়মনসিংহ থেকে ঢাকাগামী কয়েকজন পোশাক শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। গার্মেন্ট পোশাক কারখানার শ্রমিক নাজমা আক্তার বলেন, আমাদের ফোন করে বলা হয়েছে, রবিবার সকাল ৭টার মধ্যে গার্মেন্ট খুলবে। সকাল ৭টার আগেই কাজে যোগ দিতে হবে। আমরা যদি সঠিক সময়ে পোশাক কারখানায় না যাই তাহলে চাকরি চলে যাবে। তাই রাতেই বাচ্চা কোলে নিয়ে গাজীপুর চন্দ্রার পথে রওনা দিয়ে সাভারের হেমায়েতপুর আসি। মুক্তাগাছা থেকে ভ্যানে করে বাইপাস মোড় পর্যন্ত এসেছি, সঙ্গে ভাইও রয়েছে। এখন পিকাপভ্যানে করে টঙ্গীর পথে যাওয়ার চেষ্টা করছি। কোনো গাড়ি নাই তাই ভাড়াও দ্বিগুণ দিতে হবে।
সাভারের হেমায়েতপুরে এ কে এইচ গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার ফরিদ আহম্মেদ বলেন, কারখানার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ গার্মেন্ট খোলার নির্দেশনা দিয়েছেন। এ কারণে তাদের কারখানা শাখার শ্রমিকদের কাজে যোগদানের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা ইপিজেডের জেনারেল ম্যানেজার আবদুস সোবহান বলেন, বিভিন্ন কারখানা রবিবার থেকে আংশিকভাবে কাজ শুরু করতে যাচ্ছে। শ্রমিকদের সুরক্ষা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনেই কারখানা পরিচালনা করতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে রবিবার ঢাকা বিভাগের পোশাক খাতের কারখানা সীমিত আকারে খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালিক সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ।
নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম জানান, সরকার ও বেপজার সিদ্ধান্তের আলোকে চট্টগ্রামে পোশাক কারখানাসহ রপ্তানিমুখী শতাধিক কারখানা চালু করা হয়েছে। এতে সরকারি স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে বলে জানায় বেপজা কর্তৃপক্ষ। গতকাল সকাল থেকে চট্টগ্রামের তিনটি ইপিজেড এবং নগরীর শিল্পাঞ্চল নাসিরাবাদ, কালুরঘাট এলাকায় বিজিএমইএ, বিকেএমইএর শতভাগ রপ্তানিমুখী কারখানায় যাদের কাজের অর্ডার রয়েছে, তারা সীমিত পরিসরে কারখানা চালু করেছে। বেপজার মহাব্যবস্থাপক খুরশীদ আলম বলেন, শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি মেনে রপ্তানি আদেশ আছে এমন কারখানা সীমিত পরিসরে চালু হয়েছে। সিইপিজেডের অর্ধশতাধিক কারখানায় এ প্রক্রিয়ায় কাজ শুরু হয়েছে। এখানে মোট কারখানা রয়েছে ১৫৮টি। কিছু কারখানা ১৫-৪৫ দিনের লে-অফের আবেদন করেছিল। কর্ণফুলী ইপিজেডে কারখানা রয়েছে ৪১টি। এ ছাড়া কর্ণফুলী-আনোয়ারা থানাধীন কোরিয়ান ইপিজেডে অনেক শু কারখানা রয়েছে যেগুলো চালু করা হয়েছে। বিকেএমইএ সূত্রে জানা গেছে, কাট্টলী, কর্ণফুলী নদীর পাড়, কালুরঘাট বিসিক শিল্প এলাকা, নন্দীর হাট, বারিক বিল্ডিংসহ নগরের বিভিন্ন এলাকায় ২৭টি কারখানায় কাজ চলছে। বিকেএমইএর কমপ্লায়েন্স টিম শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার, হ্যান্ড স্যানিটাইজার বা সাবান পানির ব্যবস্থা ইত্যাদি মনিটরিং করছে।
গাজীপুর প্রতিনিধি জানান, গাজীপুরে করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে ঘোষিত লকডাউনের মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে গতকাল প্রায় সাড়ে ৪০০ পোশাক কারখানা খুলেছে। এসব কারখানার শ্রমিকরা দূর-দূরান্ত থেকে এসে কাজে যোগ দিয়েছেন। কারখানা খোলার খবরে গণপরিবহন না থাকার পরও বাধ্য হয়ে কর্মস্থলে আসেন তারা। অতিরিক্ত ভাড়ায় ভ্যান, রিকশা ও অটোরিকশায় চড়ে ভেঙে ভেঙে তাদের ভোগান্তি নিয়ে পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুশান্ত সরকার জানান, করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য গত ১১ এপ্রিল গাজীপুর জেলাকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকেই গাজীপুরে প্রায় সব পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। শ্রমিকদের অনেকেই তাদের গ্রামের বাড়ি চলে যান। সম্প্রতি সরকার স্বল্প পরিসরে কারখানা খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলে বিভিন্ন উপায়ে কারখানা শ্রমিকরা ফের গাজীপুরে ফিরে আসেন। রবিবার গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় ৪৩৮টি পোশাক কারখানাসহ প্রায় সাড়ে ৪০০ কারখানা চালু হয়েছে। এসব কারখানা খুলে দেওয়া হলেও কিছু কারখানা কর্তৃপক্ষ স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলছেন। স্বাস্থ্যবিধি রক্ষায় তারা শ্রমিকদের গায়ে স্প্রে করে দিচ্ছেন, থার্মাল স্ক্যানার দিয়ে জ্বর পরীক্ষা করে কর্মীদের কারখানায় ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সবার হাত ধোয়া এবং মাস্ক পরিধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে অনেক কারখানায় প্রবেশ ও বের হওয়ার সময় এবং যাতায়াতের সময় শ্রমিকরা সামাজিক দূরত্ব মানছেন না। রিকশায়, রাস্তায় গাদাগাদি করে চলাফেরা করছেন। তবে শিল্প পুলিশ কারখানাগুলো তদারকি করছে, যাতে কোনো কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ সৃষ্টি না হয়।
ব্যাংক শাখা দুই দিন খোলা থাকায় সমস্যা : করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে চলমান সাধারণ ছুটির সময় দেশে সীমিত ব্যাংকিং চালু রাখার নির্দেশ রয়েছে। তবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সব শাখা খোলা থাকছে না। বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর শাখাগুলো সপ্তাহে দুই দিন খোলা রাখছে। এতে গ্রাহকদের সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক এলাকা ঢাকার মতিঝিল ও দিলকুশা এবং চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও আগ্রাবাদে অবস্থিত সব তফসিলি ব্যাংক খোলা রাখতে হবে। একই সঙ্গে এসব এলাকায় ব্যাংকগুলোর লেনদেন ও খোলা রাখার সময়ও বাড়ানো হয়েছে। বন্দর-সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোতে লেনদেন হচ্ছে ২৪ ঘণ্টা। বন্দরের পণ্য জট এড়াতে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আজ থেকে এ নির্দেশনা কার্যকর হবে। বাণিজ্যিক এলাকার শাখাগুলো খোলা রাখা হলেও অন্যান্য এলাকার শাখাগুলোতে তিন ঘণ্টা লেনদেন হচ্ছে। কিন্তু এই তিন ঘণ্টা লেনদেনে দেখা গেছে অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকের সব শাখা খোলা রাখা হয় না। যেসব শাখা খোলা রাখছে তাও সপ্তাহে দুই দিন লেনদেন করছে। অনেক স্থানীয় শাখায় কোনো লেনদেন হচ্ছে না। এতে সব গ্রাহক ভোগান্তিতে পড়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধকল্পে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটির মধ্যে দেশের বিভিন্ন বন্দরের (সমুদ্র, স্থল ও বিমান) মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে সুবিধা প্রদানের লক্ষ্যে এসব এলাকায় (পোর্ট ও কাস্টমস এলাকা) অবস্থিত ব্যাংকের শাখা/বুথগুলো স্থানীয় প্রশাসনসহ বন্দর বা কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনাক্রমে সপ্তাহে সাত দিন ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে। এ ছাড়া প্রধান দুটি বাণিজ্যিক এলাকা তথা ঢাকার মতিঝিল ও দিলকুশা এবং চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও আগ্রাবাদে অবস্থিত তফসিলি ব্যাংকগুলোর শাখার বিষয়ে নতুন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
সঞ্চয় অধিদফতরের সব কার্যালয় খোলা রাখার নির্দেশ : জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতরের জেলা, উপজেলা পর্যায়ের সব অফিস খোলা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ থেকে এ আদেশ জারি করা হয়েছে। এ বিভাগের অধীনস্থ বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের দফতরগুলো খোলা রাখার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এ বিভাগকে অনুরোধ করা হয়েছে।
নির্দেশে বলা হয়, সাধারণ ছুটিকালীন জরুরি প্রয়োজনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতর, ট্যাকসেস ট্রাইব্যুনাল এবং কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট আপিল ট্রাইব্যুনালকে তাদের আওতাধীন বিভাগ, জেলা, উপজেলা পর্যায়ের দফতরগুলো খোলা রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি চলছে। এনবিআরের আওতাধীন ভ্যাট ও আয়কর অফিস বন্ধ থাকলেও খোলা রয়েছে সব কাস্টমস হাউস ও কাস্টমস স্টেশন। প্রথম অবস্থায় সীমিত আকারে দাফতরিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সামগ্রী খালাসে খোলা রাখা হয়। সম্প্রতি তা স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে এনবিআর নির্দেশ দেয়। সেজন্য সব কাস্টমস হাউস ও স্টেশনে দাফতরিক কাজ স্বাভাবিক রয়েছে। পুরোধমে চলছে আমদানি-রপ্তানির কাজ।
No comments:
Post a Comment