Monday, April 27, 2020

করোনা নির্মূলের পথে পাঁচ দেশ আক্রান্তের সংখ্যা কার্যত শূন্যে নামছে

করোনা নির্মূলের পথে পাঁচ দেশ
প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস নিয়ে শঙ্কিত সমগ্র বিশ্ব। এ মহামারিতে সবচেয়ে বেশি বিপন্ন দেশগুলোতে সংক্রমণ কমতে শুরু করলেও বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই এখনও এ ভাইরাসের তাণ্ডব থামছে না। ফলে করোনার বৈশ্বিক চিত্র এখনও উদ্বেগজনক। করোনার তাণ্ডব কতদিন স্থায়ী হবে, এটা আদৌ নির্মূল হবে কিনা সেসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে। তবে এর মধ্যেই আশা জাগানিয়া সংবাদ আসতে শুরু করেছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে। বিশ্বের অন্তত পাঁচটি দেশ করোনামুক্ত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

সর্বশেষ এমন সুসংবাদ আসছে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া থেকে। এ দুটি দেশে করোনা প্রবল হতে শুরু করেছিল। তবে সেখানে সরকারের সময়োচিত পদক্ষেপে পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হয়েছে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম, তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাফল্যগাথা কমবেশি সবারই জানা। তারা করোনামুক্ত হওয়ার পথে।

করোনা নির্র্মূলে বিশ্বকে পথ দেখাতে চায় নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া। এই দুই দেশে বিপরীত মতাদর্শের দুই নেতা করোনা মোকাবিলায় সাফল্যের দারুণ উদাহরণ তৈরি করেছেন। ইউরোপের কয়েকটি দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সরকারগুলো করোনা নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে, ফলে সেখানে গণতন্ত্র ঝুঁকিতে পড়েছে। বিপরীতে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় সরকারের সাফল্য গণতন্ত্রের মর্যাদা আরও বাড়িয়েছে।

নিউজিল্যান্ডের বামঘেঁষা প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আর্ডেন এবং অস্ট্রেলিয়া রক্ষণশীল খ্রিস্টান প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন করোনা মোকাবিলায় তাদের দেশকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নিয়েছেন। এখন এ দুটি দেশের টার্গেট করোনা নিমর্ূূল করা। এই দুই দ্বীপরাষ্ট্রে বর্তমানে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন হাতে গোনা কয়েকজন। গত মাসেও তাদের দেশে দৈনিক আক্রান্ত হয়েছেন শত শত লোক। করোনা নির্মূলে তাদের অবিস্মরণীয় টার্গেট ভীষণভাবে আশান্বিত করেছে মানুষকে। বাগাড়ম্বর না করেই এ দুই দেশের নেতারা বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, নীরবে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন সুচারুভাবে। এর ফলে তারা পেয়েছেন প্রশংসনীয় সফলতা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা ও অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির মাইক্রোবায়োলজির অধ্যাপক পিটার কলিংনন নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের নেতাদের পথ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের থেকে একেবারেই আলাদা। এখন তো রাজনীতির সময় নয়। এখন সময় তথ্যের ভিত্তিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড চাচ্ছে সংক্রমণ শূন্যে নামিয়ে আনতে। এরপর যাতে তা আর না বাড়ে সে পদক্ষেপও নিয়েছে তারা। চীন, হংকং ও সিঙ্গাপুর কিছুদিন করোনাভাইরাস দূরে রাখতে সক্ষম হলেও সেখানে দ্বিতীয় দফায় আক্রান্তের হার বেড়ে যায়। সেটির পুনরাবৃত্তি রোধ করতে চায় অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড।

অস্ট্রেলিয়ায় করোনা শনাক্ত হয় ২৫ জানুয়ারি। এরপর ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই চীন থেকে ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেন স্কট মরিসন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাকে মহামারি ঘোষণার দুই সপ্তাহ আগেই অস্ট্রেলিয়া এ ঘোষণা দেয়। বিভিন্ন রাজ্যকে হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোরও নির্দেশ দেয় সরকার। এ নিয়ে নিয়মিত রেডিও ভাষণ দেন মরিসন।

নিউজিল্যান্ডে করোনা শনাক্ত হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি। এর পরই কঠোর পদক্ষেপ নেন জাসিন্ডা আর্ডেন। তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিতে থাকেন। তিনি প্রথমেই অ্যালার্ট সিস্টেম চালু করেন। এর কিছুদিনের মাথায় জারি করা হয় লকডাউন। আর্ডেন বলেছিলেন, 'আমাদের কঠিন লড়াই করতে হবে এবং এটা হতে হবে ত্বরিত।' তিনি ফেসবুক লাইভে নিয়মিত জনগণের মুখোমুখি হতে থাকেন।

নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় সরকারের সব সংস্থা একই সুরে কথা বলেছে। ফলে জনগণ শুরুতে কঠোর ব্যবস্থার বিরোধিতা করলেও পরে তা মেনে নিয়েছে। তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে এই দুই নেতা যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার প্রশংসা করেছেন বিজ্ঞানীরাও।

কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটির ভাইরোলজিস্ট ইয়ান ম্যাকে কাজ করছেন জেসিন্ডার সহযোগী হিসেবে। তিনি বলেন, এ সময়টাতে বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড তাই করেছে। এর সুফলও পাচ্ছে তারা। দুই দেশেই করোনার লেখচিত্র তলানিতে ঠেকছে।

আড়াই কোটি জনসংখ্যার অস্ট্রেলিয়ায় গতকাল রোববার পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৬৭১১ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৮৩ জনের। আক্রান্তদের মধ্যে ৫৫৩৯ জন সুস্থ হয়েছেন। এখন পর্যন্ত বিশ্বে মাথাপিছু হিসাবে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা করেছে অস্ট্রেলিয়া। গত ১৯ এপ্রিল থেকে সেখানে দৈনিক আক্রান্ত হচ্ছেন ৮ থেকে ৩০ জনের মধ্যে। শূন্য আক্রান্তের দিনও গেছে এ সময়।

নিউজিল্যান্ডে মার্চে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকলেও এখন বাড়ছে এক শতাংশেরও কম হারে। ৫০ লাখ জনসংখ্যার দেশটিতে মোট আক্রান্ত হয়েছেন ১৪৫৬ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। আক্রান্তদের মধ্যে ১১৪২ জন সুস্থ হয়ে ফিরেছেন। গত এক সপ্তাহ ধরে সেখানে আক্রান্ত হচ্ছেন ২ থেকে ৫ জন করে। জাসিন্ডা আর্ডেন তার দেশ থেকে করোনাভাইরাস নির্র্মূল করার প্রত্যয়ের কথা ঘোষণা দিয়েছেন গত ২৩ মার্চ। তার দেশের বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটা অসম্ভব নয়। পরিস্থিতি উন্নতি হওয়ায় প্রশান্ত মহাসাগরের তীরবর্তী অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের দৃঢ়প্রত্যয়ী দুই প্রধানমন্ত্রী আবার নিজ দেশের মধ্যে পুনরায় ভ্রমণ চালু নিয়ে আলোচনা করেছেন।

অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের আগেই অবশ্য করোনা নিয়ন্ত্রণে সাফল্যে দারুণ দৃষ্টান্ত রেখেছিল চীনের নিকটবর্তী দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান। করোনা মোকাবিলায় আরেক সফল দেশ ভিয়েতনামে এ রোগে একজনের মৃত্যু হয়নি। সম্প্রতি টানা দশ দিন সেখানে কেউ আক্রান্ত হয়নি। ফলে দেশটির লকডাউন প্রত্যাহার করা হয়েছে। ভিয়েতনামে আক্রান্ত ২৭০ জনের মধ্যে ২২৫ জন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়েছেন।

দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্চের শুরুতে দৈনিক শত লোক করোনায় আক্রান্ত হলেও এখন সেখানে শনাক্ত হচ্ছে ৮ থেকে ১০ জনের মতো রোগী। দেশটিতে ১০ হাজার ৭২৮ জন আক্রান্তের মধ্যে ইতিমধ্যেই সুস্থ হয়েছেন ৮৭১৭ জন। মারা গেছেন ২৪২ জন। তাইওয়ানেও আক্রান্তের হার কার্যত শূন্যে নেমেছে। হংকংও গতকাল দেখেছে শূন্য আক্রান্তের দিন।

No comments:

Post a Comment