Friday, April 24, 2020

ও মা তুমি আমাকে আর বাইরে নিয়ে যাবে না?

কাজল ঘোষ

অনলাইন ২৪ এপ্রিল ২০২০, শুক্রবার, ১০:৩২

ছবিঃ জীবন আহমেদ
‘মা, মা, ও মা বাইরের দুষ্টু বাসাত কি যাবে না?’ বাতাসকে শুরু থেকেই শ্রয়ণ বলে বাসাত। পাঁচ বছর হতে চলল শ্রয়ণের। সপ্তাহান্তে বা ছুটির দিনগুলোতে কোথাও না হোক স্বজনদের বাসায় তার বাবা মা তাকে নিয়ে যেত। কিন্তু এখন কোথায় যেতে চাইলেই তা মা বলে ওঠে, ‘বাবা বাইরে দুষ্টু বাসাত, এখন বাইরে যাওয়া যাবে না।’ করুণ কন্ঠে শ্রয়ণের ফের প্রশ্ন, ‘মা, ও মা, তুমি কিনা আর বাইরে নিয়ে যাবে না।’
এমন হাহাকার সুরে মাকে করা প্রশ্ন কেবল শ্রয়ণের একার নয়। এই শহরে বন্দিদশায় থাকা সকল শিশুদেরই। যে শিশুটি কথা বলতে পারছে না সে-ও দরোজা খুলতেই বাইরে যাওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়। একাধিক বাবা, মায়ের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, শিশুরা যেমন অসহায় এই পরিস্থিতিতে; তাদের অভিবাবকরাও অসহায়। তাদের কথা কেউ ভাবছে না।   
টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র নিয়ে গবেষণা করেন বিধান রিবেরু।
তার ফেসবুক ওয়ালে একমাত্র ছেলের একটি ছবি পোস্ট করেছেন তিনি। জালে বন্দি। মুক্তির জন্য ছটফট করছে, কিন্তু কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। ছবিটি অনেক না বলা কথার সাক্ষ্য দিচ্ছে।
বাবা একটি দৈনিকের নগর সম্পাদক। মা বেসরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। তাদের আড়াই বছরের ছেলে। সাধারণত লকডাউনের আগে তাকে প্রায়ই ছুটির দিনগুলোতে রাস্তায় হাঁটতে নিয়ে যেতেন। এখন তা বন্ধ। কিন্তু আড়াই বছরের শ্রেয়ান তার কতটুকু বোঝে। সে এখন বাবা মা দুজনকেই একসঙ্গে কাছে পাচ্ছে। তাতেও তার অস্থিরতার কমতি নেই। একটু পরপর খালি, ‘বাইলে যাব, বাইলে যাব করছে।’
সূত্রাপুরের কাগজি টোলার বাসিন্দা সাবিত্রী দাস। তার পুত্র পঞ্চম শ্রেনীর ছাত্র রুদ্র। লকডাউনের শুরুতে এক আধটু বাসার সামনের রাস্তায় নামত। এখন পুরনো ঢাকায় করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় একদম বাইর যাওয়া মানা। তাই তিনতলা বাসার ভেতেরে আর বারান্দায় বল নিয়ে ছুটোছুটি করাই তার নৈমিত্তিক রুটিন দাঁড়িয়ে গেছে।


টিকাটুলিতে দশতলা ভবনের একটি ফ্ল্যাট। সেখানকার ছেলেমেয়েরা সকলে দলবেঁধে নিচে নেমে খেলায় মত্ত হতো। সোসাইটির নোটিশ, এখন থেকে নিচে নামা নিষিদ্ধ। সকলেই বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করলেও ছোটরা এর কিছুই বুঝে না। দশতলার ছাদে উঠলে দেখা যায়, নগরীর সব ছাদগুলো বিকালে পূর্ণতা পায়। প্রায় সকল বাসার ছাদেই একটি বা দুটি করে পরিবার বসে গল্প করছে। কোথাওবা ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে এপাশ ওপাশ করছে কিশোররা। অনেক ছাদেই আবার ঘুড়ি উড়াবার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চলছে। আর ছাদ আড্ডায় আসছে ঘুরে ফিরেই করোনা প্রসঙ্গ।  
প্রায় বাসার ড্রয়িং রুমে চলছে কার্টুন নেটওয়ার্ক, দুরন্ত তারপর হিন্দি ডাব করা মটু, পাতলু। কিন্তু আর কত? ইউটিউবে স্ক্রল চলছেই। একই ডায়নোসর আর ড্রাগন তাদের কাছেও এখন একঘেঁয়েমিতে পৌঁছেছে। সময় যে কাটেনা। এমনিতেই এই শহরে রয়েছে মাঠের সঙ্কট। খেলার পার্ক নেই। শিশুদের বিনোদন বলতেই আশপাশে কোন রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাওয়া। খেলাধুলার কর্নারে লাফালাফি করা। তাও এখন সব বন্ধ। করোনা অবুঝ শিশুদের জীবনকে করে তুলেছে করুণ। লকডাউন বাড়ছেই। সবশেষ হিসেব অনুয়ায়ী টানা ৪২ দিনে পৌঁছবে এই বন্দিদশা। শিশুদের নিয়ে সবখানেই বিপাকে অভিভাবকরা। লকডাউন তাদের অজানা। করোনা তাদের ধর্তব্যের বিষয় নয়।
শিশুদের জন্য করণীয় কি, এমন প্রশ্নে শিশু হাসপাতালের হাই ডিপেনডেন্সি ও আইসোলেশন ইউনিটের প্রফেসর ডা. রিয়াজ মোবারক বললেন, শিশুদের খেলার সঙ্গী হতে হবে তার বাবা মাকেই। এসময়টিতে তাদের অনেক কাছাকাছি থাকতে হবে। দিনভর মজার মজার খেলার উপাদান খুঁজে বের করতে হবে। বাচ্চাদেরকে ছবি আঁকা, বিভিন্ন শিক্ষামূলক বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। খেয়াল রাখতে শিশুরা যেন কোনভাবেই মানসিকভাবে অসহায় হয়ে না পড়ে। এসময়টাতে তাদের প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি খাওয়াতে হবে। প্রোটিন জাতীয় খাবার দিতে হবে। যেন কোনভাবেই তারা দুর্বল হয়ে না পরে। আর লক্ষ্য রাখতে হবে, অপরিচিত কারও সাথেই যেন মিশতে না পারে।




২৪ এপ্রিল ২০২০
২৪ এপ্রিল ২০২০


২৪ এপ্রিল ২০২০


অনলাইন সর্বাধিক পঠিত


No comments:

Post a Comment