নারায়ণগঞ্জ লকডাউন উপক্ষো করে গতকাল নৌকাভর্তি যাত্রী পারাপার। ছবি : আমাদের সময়
এরই মধ্যে ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা সীমিত পরিসরে অবরুদ্ধ করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় সম্পূর্ণ ও আংশিক লকডাউন করে দেওয়া হয়েছে ৪২ জেলাকে। এর মধ্যে গত মঙ্গল ও বুধবার নতুন করে ৮ জেলা এবং বেশ কয়েকটি উপজেলা ও গ্রামকে লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে মূলত ‘যেখানে করোনা রোগী, সেখানেই লকডাউন’ নীতিতে চলছে প্রশাসন। কিন্তু তাতেও সামাজিক দূরত্ব মানানো সম্ভব হচ্ছে না সাধারণ মানুষকে।
লকডাউন হওয়া জেলার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ ও কক্সবাজার রয়েছে উচ্চঝুঁকিতে। বিশেষ করে কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে বসবাসকারী প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে ‘দূরত্ব’ নিশ্চিত করা অসম্ভব। তাই করোনা রুখতে ক্যাম্পগুলোতে যাতায়াতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীসহ সারাদেশে যে হারে করোনা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে এবং বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে, এটির বিস্তার রোধে লকডাউনই একমাত্র সমাধান। কিন্তু সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ঢাকা পুরোপুরি লকডাউন করা হয়নি। দেশে এ পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া ১ হাজার ২৩১ জনের মধ্যে বেশিরভাগই ঢাকার। এমন বাস্তবতার পরও রাজধানীর
প্রায় প্রতিটি এলাকায় নানা অজুহাতে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। অলিগলিতে চলছে আড্ডাবাজি। লকডাউনের মধ্যেই পুলিশ ও প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে করোনার ‘হটস্পট’ ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে এখনো গ্রামে পালিয়ে যাচ্ছে মানুষ। তাদের অনেকে করোনার উপসর্গ নিয়ে বাড়ি ফিরে মৃত্যুর কোলেও ঢলে পড়েছেন। ফলে সারাদেশে উচ্চমাত্রায় করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লকডাউন পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। অবরুদ্ধ ঘোষণা করতে হবে পুরো ঢাকা শহরকেই। প্রয়োজনে ‘কারফিউ’ জারি করা উচিত। ঢাকায় এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে এর কার্যকারিতা দেখে পুরো দেশেই পদক্ষেপ নিতে হবে। সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে পুলিশ ও প্রশাসনকে হতে হবে আরও কঠোর।
গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। এর ১১ দিন পর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলাকে সর্বপ্রথম লকডাউন ঘোষণা করে প্রশাসন। সাধারণ মানুষকে ঘরে রাখা এবং সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে গত ২৬ মার্চ থেকে ঘোষণা করা হয় সাধারণ ছুটি। তবে এর পর থেকেই অধিকাংশ নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং শ্রমজীবী মানুষের আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়। তাদের অধিকাংশের ঘরেই প্রয়োজনীয় খাবার নেই। এমন পরিস্থিতিতে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। তবে খাদ্য ব্যবস্থাপনায় পুরোপুরি শৃঙ্খলা না থাকায় সাধারণ মানুষকে ঘরে রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কোথাও কোথাও ত্রাণের দাবিতে বিক্ষোভ করতেও দেখা গেছে।
ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য আসলামুল হক আমাদের সময়কে বলেন, ‘করোনা সংক্রমণ রোধে যেসব এলাকা লকডাউন করা হয়েছে, সার্বক্ষণিক সেখানকার মানুষের খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। খাদ্য সহায়তা থেকে শুরু করে যে কোনো সমস্যায় হটলাইনে যোগাযোগ করার জন্য সবাইকে বলা হয়েছে।’ পুুলিশের ওয়ারী বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) শাহ ইফতেখার বলেন, ‘যেখানে করোনা রোগী শনাক্ত হচ্ছে, সেখানেই লকডাউন করে দেওয়া হচ্ছে। করণীয় বিষয়ে দেয়ালে দেয়ালে সেঁটে দেওয়া হচ্ছে লিফলেট। তাদের যে কোনো প্রয়োজনে পুলিশের সহায়তা নিতেও বলা হচ্ছে। খাদ্য নিশ্চয়তা থেকে শুরু করে যে কোনো সমস্যায় আমরা তাদের সহায়তা দিচ্ছি।’
খাদ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে অসহায় ও দরিদ্র লোকদের তালিকা করেছি। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত যাদের ঘরে খাবার নেই, তাদের তালিকাও করা হয়েছে। যারা লাইনে দাঁড়াতে পারেন না, তাদের আমরা দুভাবে চিহ্নিত করছি। একটি হলোÑ ইউনিয়ন এবং উপজেলা থেকে তালিকা প্রণয়ন। অন্যটি ফেসবুকে গুগলের একটি ডিজিটাল ফরম দেওয়া হয়েছে, তারা সেখানে নিবন্ধন করছেন। এরই মধ্যে প্রায় ৮ হাজার লোক নিবন্ধন করেছেন। সেগুলো উপজেলাওয়ারী পাঠানো হচ্ছে এবং তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’
লকডাউনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘জেলার প্রবেশমুখগুলোতে সেনাবাহিনী ও পুলিশের চেকপোস্ট রয়েছে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটও সেখানে কাজ করছেন। কেউ কক্সবাজার জেলায় আসতেও পারছেন না এবং বেরও হতে পারছেন না। এটি নিশ্চিত করা হয়েছে। তার পরও কিছু অসচেতনতা আছে। সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি। লকডাউন নিয়ে কেউ যেন আতঙ্কিত না হন, সে জন্য চেষ্টা করছি। লোকাল মিডিয়াগুলোতেও এ বিষয়ে প্রচার চালাচ্ছি। ফেসবুকে ও ইউনিয়নে মাইকিং করেও বিষয়টি প্রচার করছি।’ রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘স্বল্প জায়গায় বিভিন্ন ক্যাম্পে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করেন। সেখানে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা অসম্ভব ব্যাপার। তবে লক্ষণ দেখা দিলে আলাদা একটি জায়গা করেছি সেখানে নিয়ে রাখা হচ্ছে।’
পুুুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) সোহেল রানা আমাদের সময়কে বলেন, ‘সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং মানুষকে ঘরে অবস্থানের বিষয়টি নিশ্চিতে কাজ করছে পুলিশ। এরই মধ্যে সবার জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখার জন্য যে কোনো জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এককভাবে বা দলবদ্ধভাবে বাইরে ঘোরাফেরা বন্ধ করতে মাঠপর্যায়ে পুলিশ কাজ করছে। এমনকি সরকারি নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত জরুরি সার্ভিস ছাড়া লোকজনকে ঢাকায় প্রবেশ অথবা ত্যাগ করতে দেওয়া হচ্ছে না।’
‘হটস্পট’ থেকে পালাচ্ছে মানুষ : করোনার ‘হটস্পট’ ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে পালিয়ে সাধারণ মানুষ গ্রামের যাচ্ছে। গত ৯ এপ্রিল ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও জেলায় প্রবেশের সময় একটি যাত্রীবাহী বাস ও ১৪টি মাইক্রোবাস, পিকআপ ও অ্যাম্বুলেন্স জব্দ করেছে পুলিশ। গোপনে গাড়িগুলোতে করে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে শতাধিক যাত্রী ঠাকুরগাঁওয়ে প্রবেশের চেষ্টা চালিয়েছিল। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ থেকে যাত্রী বোঝাই একটি বাস ওইদিন ভোরে রানীশংকৈল উপজেলার নেকমরদে যাওয়ার পর ওই এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শুধু ঠাকুরগাঁও নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকায়ই এভাবে লোকজন ছড়িয়ে পড়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেরই করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে বলেও খবর পাওয়া যায়। পরীক্ষা করে কারও কারও মধ্যে করোনা ভাইরাসও শনাক্ত হয়। ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক ড. কেএম কামরুজ্জামান সেলিম আমাদের সময়কে বলেন, ‘সম্প্রতি যারা জেলার বাইরে থেকে এসেছেন, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ জনকে প্রাতিষ্ঠানিক ও বাকিদের রাখা হয়েছে হোম কোয়ারেন্টিনে।’
জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ থেকে নরসিংদীর চরাঞ্চল আলোকবালীতে গিয়ে করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যান এক নারী। তার আগে পটুয়াখালীতে এক পোশাক শ্রমিকের মৃত্যু হয় করোনার উপসর্গ নিয়ে, যিনি নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রামে গিয়েছিলেন। নারায়ণগঞ্জ থেকে বাড়ি গিয়ে এমন আরও অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা যায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ জায়েদুল আলম আমাদের সময়কে বলেন, ‘লকডাউন ঘোষণা করার আগে কিছু লোক নারায়ণগঞ্জ ছেড়েছে। তবে লকডাউনের পরও নৌপথে ঢাকা থেকে নবাবগঞ্জ-দোহার হয়ে মুন্সীগঞ্জ এবং নারায়ণগঞ্জ বর্ডার দিয়ে কিছু লোক বরগুনার আমতলীতে গেছে। কিন্তু সড়কপথে কেউ নারায়ণগঞ্জ থেকে যেতে পারেনি। হেঁটে বিচ্ছিন্নভাবে কেউ কেউ অবশ্য বাড়ি ফিরেছে।’
এখনো লকডাউন মানছেন না নগরবাসী : ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লেও এখনো সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। গতকাল নগরীর বিভিন্ন এলাকার অলিগলিতে সাধারণ মানুষের আনাগোনা দেখা গেছে। রাজধানীর পুরান ঢাকা, যাত্রাবাড়ী, মতিঝিল, রামপুরা, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, আদাবর, মিরপুর, উত্তরাসহ বিভিন্ন এলাকায় লকডাউন না মেনে তারা রাস্তায় নেমে আসছেন প্রয়োজনে-অপ্রয়োজেন। এ বিষয়ে পুলিশের ওয়ারী বিভাগের ডিসি শাহ ইফতেখার আহমেদ বলেন, ‘সাধারণ মানুষকে ঘরে রাখার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। যারা অপ্রয়োজনে বের হচ্ছেন, তাদের ঘরে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের সচেতন করতে সব ধরনের চেষ্টা চলছে।’
বিশেষজ্ঞ মতামত : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক আমাদের সময়কে বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় একমাত্র উপায় শৃঙ্খলা মানা, সরকার ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে ঘরে অবস্থান। এটি নিশ্চিত করতেই সরকার ছুটি ঘোষণা করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ এটিকে উৎসব মনে করে চূড়ান্ত রকমের বিশৃঙ্খলা দেখিয়েছে। এখন পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনকে চূড়ান্ত রকমের কঠোর হতে হবে। কঠোর হওয়া মানে আমি বলছি কাউকে মেরে ফেলতে হবে সেটি নয়, বলছি-নমনীয়ভাবে কঠোর হওয়া। আমরা যদি ইতালি, স্পেন বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো অবস্থা দেখতে না চাই, তবে সাধারণ মানুষকে ঘরে রাখার একমাত্র উপায় হচ্ছে কারফিউ জারি করা। এর কোনো বিকল্প নেই। ঢাকায় অন্যান্য এলাকার চেয়ে আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি। এটি ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ঢাকায় অন্ততপক্ষে কারফিউ জারি করা হোক। তা না হলে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হবে। ঢাকায় কারফিউ দিয়ে আগে প্রভাব যাচাই করে দরকার হলে সেটি সারাদেশে জারি করা প্রয়োজন।’
খাদ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি বলেন, ‘এ সংকটে শ্রমজীবী মানুষের খাবারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হয় তাদের ঘরে যদি খাবার পৌঁছে দেওয়া যায়। তা হলেই তারা ঘরে থাকবে। আমাদের দেশে খাদ্য ব্যবস্থাপনায় চূড়ান্ত রকম বিশৃঙ্খলা আছে। এ ক্ষেত্রে খাবার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সেনাবাহিনীকে দেওয়া উচিত। তাদের সহযোগিতা করবেন জনপ্রতিনিধিরা। যদি সেনাবাহিনীকে দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং লোকাল ফোর্স যারা আছেন তারা সহযোহিতা করেন, তবে এ সমস্যা থেকে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব।’
করোনার কারণে মধ্যবিত্তরা সংকটে আছেন, উল্লেখ করে তৌহিদুল হক বলেন, ‘যে কোনো সংকট যখন দীর্ঘমেয়াদি হয়, তখন মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে নিয়ে চিন্তিত হতে হয়। কারণ তাদের সংকট মোকাবিলায় সক্ষমতা সেটি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। সরকারের এখন তাদের নিয়েও ভাবতে হবে। যদিও মধবিত্তদের সহায়তা করতে পুলিশ ও প্রশাসন চেষ্টা করছে। তাদের চাহিদা ও জীবনযাপনের যে অভাব সেগুলো পূরণ করতে হবে।’

No comments:
Post a Comment