বিষয়টি শুধু ‘টাকা ছাপানোর’ ব্যাপারে সবার মনোযোগ কিভাবে আকর্ষন করে ফেললো আমি জানি না। তবে আমি অনেকটা নিশ্চিত-টাকা ছাপানোর দরকার নেই। করোনা সমস্যাটি অভূতপূর্ব, বৈশ্বিক আর স্বাস্থ্যসেবার সমস্যার চাইতেও ব্যবস্থাপনার সমস্যা বিবেচনায় দরকার-সরকার, এনজিও আর ব্যক্তিখাতের সকল উদ্যোগকে একই দিকে ধাবিত করা। বিপন্ন, দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের কাছে ত্রান সহায়তা পৌঁছে দেওয়া আর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ফিরিয়ে আনা।
একটি কথা পরিস্কার বলে নেই- ইতোমধ্যে সরকার যে নব্বই হাজার কোটি টাকার ওপর প্রণোদনা বা তারল্য সহায়তা ঘোষণা করেছেন, তার প্রায় পুরোটাই আসবে ব্যাংক-ব্যবস্থা আর সরকারের বাজেট বরাদ্ধ থেকে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যেই বাণিজ্যিক ব্যাংকের সংবিধিবদ্ধ নগদ জমার হার দেড় শতাংশ কমিয়ে প্রায় ১৮৬০০ কোটি টাকা ব্যাংকগুলোতে তারল্যের সংস্থান করেছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ব্যাংকগুলোর এসএলআর বা স্ট্যাটুটরি লিকুইডিটি রেশিও বাবদ ২ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকার বিপরীতে জমা রয়েছে তিন লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। সরকার অনুমোদিত সিকিউরিটিতে অতিরিক্ত জমা হটাৎ তুলে না নেওয়া গেলেও তার বিপরীতে ‘রেপো’ করে সহজেই তারল্য সৃষ্টি করা সম্ভব। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই কারণেই হয়তো ‘রেপো’ রেট বা হারও ০.৫০ শতাংশ কমিয়েছেন।
তথ্যাভিজ্ঞ মহল জেনে থাকবেন- বাংলাদেশে বছরে গড় মানি গ্রোথ সাড়ে দশ শতাংশ থেকে বারো শতাংশ। বিপরীতে আমাদের বছরে বাজেট ঘাটতি গড়ে ৫ থেকে বড়জোর এই বছরে রাজস্ব আদায়ে বিরাট ঘাটতিজনিত কারনে করোনা অভিঘাত না বিবেচনা করেই হয়তো ৬ শতাংশে পৌঁছাতো। করোনা প্রনোদনা ব্যবহার বা ত্রান সহায়তায় বাজেট ঘাটতি ১০ শতাংশে পৌঁছালেও মানি গ্রোথ আরও পঞ্চাশ শতাংশ বা ৫-৬ শতাংশ বাড়িয়ে অর্থের সংস্থান করা সম্ভব। কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইলে সিআরআর (নগদ জমা) কিংবা এসএলআর (সরকারি সিকিউরিটিতে জমা) আরো কমিয়ে এনে আরও টাকার সংস্থান করতে পারে। নিম্ন চাহিদা বা ক্রয়ক্ষমতা আর উচ্চ মূল্যস্ফীতিজনিত সংকটাবস্থা ঠিক করতে অনেক বড় বড় দেশেরও ১০-১৫ বছর লেগে গিয়েছিলো। তাই সমস্যার সমাধান টাকা ছাপানোতে নয়, সামনে গভীর সংকট বিবেচনায় সকলকে নিয়ে বর্তমান স্বাস্থ্য সংকট এবং মধ্য ও দীর্ঘকালীন খাদ্য, কর্মযজ্ঞ সৃষ্টির সমস্যার সমাধান।
আমাদের এবার ভালো বোরোধান ফলেছে কিন্তু ধান কাটার পর্যাপ্ত লোক নেই, আউশধানও হয়তো ভালো হবে, তবে তা-ও যথেষ্ট নয়। কারণ আগে যাদের আয় ছিলো-নিম্ন আয়ের তারাও এখন সরকারের কাছে হাত পাতবে। সাধারণ সময়েও আমরা প্রয়োজনের ২-৫ শতাংশ চাল আমদানি করতাম। এখন আমদানি করবো কোত্থেকে? ২০০৭-০৮ সালের ভারত থেকে সম্ভাব্য চাল আমদানির ব্যাপারটি সবাই নিশ্চয়ই ভুলে যাননি। চালের বাইরের অন্যান্য সামগ্রী আসবে কোথা হতে? তাই প্রয়োজন খাদ্য ও নগদ সহায়তা দুটোই।
শুধু সরকারি ত্রাণ বা সামাজিক সুরক্ষার বরাদ্দ এখানে যথেষ্ট নয়। সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে সকল এনজিও এবং ব্যক্তিখাতের প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তির নিজস্ব উদ্যোগকেও। ত্রাণ বিতরণে পুলিশ-সামরিক বাহিনীকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে, ভালো। তারা হয়তো নিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিবেন। এক্ষেত্রে তার চেয়েও বড় প্রয়োজন এনজিওদের।
সরকারের সহায়তার তালিকা হালনাগাদ একটি কঠিন কাজ। এই দূর্দিনে সম্ভবও নয়। তদুপরি বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি গ্রামে রয়েছে বেশকিছু নারী নেতৃত্বাধীন পরিবার। তাদের বেশীরভাগই সরকারের ত্রান-নেটওয়ার্কে নেই। গরিবদের কেউ কেউ থাকলেও নতুনরা নেই। নেই শহর থেকে কাজ হারিয়ে ফেরত আসারা। একাজে এনজিওদের চাইতে ভালো কাজ কেউ করতে পারবেন না। একইভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে ব্যক্তি-ত্রাণ উদ্যোগকেও। সৃষ্টি করতে হবে মহা কর্মোদ্যোগ। আজকের সমস্যা আগের যেকোনো সমস্যার চাইতে বহু বহুগুন বেশি। সবার সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া বাংলাদেশের মতো একটি দেশ এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাবে না। যেতে হবে বহুদূর এবং একসাথে, দক্ষ নেতৃত্বে। সমন্বয় আর মনিটরিংয়ের গুরুত্বের কথা বলেও শেষ করতে পারবো না।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক।
মতামত লেখকের নিজস্ব, কর্তৃপক্ষের নয়
No comments:
Post a Comment