মো. শফিকুল ইসলাম
সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানা যাচ্ছে- বিভিন্ন জেলার পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে করোনা প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর থেকে ত্রাণের চাল, বিশেষ ওএমএস (চাল/আটা), খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও ভিজিডির চাল বিভিন্ন ডিলার, ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য, গোডাউনসহ তাদের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির দ্বারা আত্মসাৎ করছে, যা খুবই দুঃখজনক। বিষয়টি সর্বমহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করছে।
কিশোরগঞ্জে ঘটেছে মানবতার চরম বিপর্যয়, করোনাভাইরাস সংক্রমণের ভয়ে এক বৃদ্ধাকে হাসপাতালে ফেলে রেখে যায় তার স্বজনরা। এমনকি স্বজনরা তাকে হাসপাতালে ভর্তির সময় ভুল তথ্য দিয়ে থাকে, যাতে তাদের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ খুঁজে না পায়। বৃদ্ধা চার দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছেন। ওই লোকটি স্ট্রোকের রোগী। তার যে ধরনের ওষুধ দরকার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা সরবরাহ করতে পারছে না। তাহলে আমরা কি একটু মানবতা নিয়ে সেই লোকটির বিপদে সহায়তা করতে পারছি?
বগুড়ার শিবগঞ্জে এক ব্যক্তিকে নিয়ে অমানবিক ঘটনা ঘটেছে। ওই লোক যখন প্রচণ্ড জ্বরে অচেতন ও মুমূর্ষু অবস্থায়, দিশেহারা হয়ে তার স্ত্রী সারারাত চেষ্টা করের কারও সহযোগিতা পায়নি, একের পর এক হটলাইন, প্রতিবেশী, পরিচিতজন, ডাক্তার ও পুলিশকে কল করলেও কেউ ডাকে সাড়া দেয়নি। তার সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। অবশেষে তার মৃত্যু হলো। করোনা আতঙ্কে ভয়ে কেউ তার পরিবারের আকুতিতে সাড়া দেয়নি। ওই মহিলার কথা শুনে মনে হচ্ছে, করোনা আতঙ্কে আমরা মানবতার কাছে হেরে গেছি।
করোনা সন্দেহে হাসপাতালে জায়গা হয়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীর। অবশেষে সে মারা গেল, এখানেও মানবতার পরাজয়। কী দোষ ছিল তার। বিনা চিকিৎসায় মারা গেল। মৃত্যুর আগে চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে গেলে করোনার ভয়ে কোনো হাসপাতালই ভর্তি করেনি। নামকরা হাসপাতালগুলো কীভাবে এ ধরনের অমানবিক কাজ করল, ভেবে শেষ করতে পারছি না। তাদের তো কোনো ক্ষতি হয়নি, ক্ষতি হয়েছে দেশের, পরিবার হারিয়েছে তার এক অমূল্য সম্পদ, যা আর কোনোদিন ফিরে পাওয়া যাবে না।
সবাই আমরা করোনা আতঙ্কে, আর অন্যদিকে পুলিশ পরিচয়ে করোনাভাইরাসের রোগী তল্লাশির নামে এক শিশুকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে দলবেঁধে ধর্ষণের অভিযোগ সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পারি। এরা কী মানুষ না অন্যকিছু। এদের আইনের আওতায় নিয়ে চরম শাস্তি দেওয়া উচিত। যেখানে মানবতা নিয়ে এগিয়ে যাবে মানুষকে রক্ষা করতে, বরং তা না করে ধর্ষণ করে। ধিক্কার জানাই এদের।
রাস্তায় সন্তান প্রসবের ঘটনা শুনতে হচ্ছে আজকের দিনে, যদি তা আকস্মিক হতো, তা মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু কারও যদি অবহেলায় এরকম পরিস্থিতিতে কোনো নারীকে মুখোমুখি হতে হয়, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। কোথায় আছে মানবিকতা, দিন দিন হারিয়ে ফেলছি সহমর্মিতা ও অন্যর প্রতি ভালোবাসা। দায়িত্বরত কর্মীর অবহেলার কারণে গাইবান্ধা মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটেছে।
চট্টগ্রামে রাস্তায় পড়ে আকস্মিক মৃত্যুবরণ করেন দুই ব্যক্তি, কিন্তু করোনা সংক্রমণের ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি। দীর্ঘক্ষণ রাস্তায় পড়ে ছিল হতভাগা দুই ব্যক্তির মৃতদেহ। এখানেও মানবতা ব্যর্থ। অবশেষে পুলিশ এসে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।
রাষ্ট্র বা সমাজের এ দুঃসময়ে যারা ত্রাণ দিচ্ছেন, নিঃসন্দেহে এটা মানবিক ও প্রশংসামূলক কাজ। তবে এই মানবিক কাজ করতে গিয়েও আমরা রাষ্ট্রকে ঝুঁকির মুখে ফেলছি কি? যারা জনসমাগম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করে ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছেন, তাদের কাছ থেকে যারা গোপনে বা নিয়ম মেনে ত্রাণ দিচ্ছেন, তারা নিশ্চয়ই বেশি মানবিক আচরণ করছেন। কিন্তু কিছু ধান্দাবাজ লোক এই ত্রাণের চাল মেরে খাচ্ছে, যা পাওয়ার কথা ছিল সমাজের হতদরিদ্র মানুষের। আমরা এখানেও মূল্যবোধহীন কাজ করছি।
আসুন আমরা সবাই মানবিক হই। মানবতা, ভালোবাসা, মনুষ্যত্ব ও সহমর্মিতা দিয়ে সমাজ, দেশ এবং সুন্দর পরিবেশ গড়ে তুলি। যেখানে থাকবে না কোনো বৈষম্য, ধর্ষণ, নিপীড়িত ও নির্যাতিত মানুষ। আমাদের একটু সহযোগিতায় ও মানবতায় একটি দেশ গড়ে উঠতে পারে সুখ-শান্তিতে পরিপূর্ণ। আমরা সচেতন হই এবং অন্যকে সচেতন হতে উৎসাহিত করি, যা করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে আমাদের মুক্তি দিতে পারে। এই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার একমাত্র পন্থাই একে অপরের সহযোগী হয়ে কাজ করা।
শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ
shafiq@jkkniu.edu.bd
শিক্ষক, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ত্রিশাল, ময়মনসিংহ
No comments:
Post a Comment