Tuesday, May 26, 2020

মাছের খাবার বানানো, জাল তৈরি... মাছ চাষে নতুন দিশা দেখিয়ে নীলকান্ত এখন হিরো

1
অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুসারে, আমাদের দেশের ৭০ শতাংশ লোকের জীবিকা চাষবাসের উপর নির্ভরশীল। তাঁদের মধ্যে ৮২ শতাংশই ছোট ও মাঝারি চাষি। এদের মধ্যে অনেকেই উপযুক্ত প্রশিক্ষণ ও জ্ঞানের অভাবে কম খরচে উন্নতমানের চাষ করতে পারেন না। তার উপর আছে প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা। এর জেরে রোজগারের ক্ষেত্রে মার খেতে হয় তাঁদের।
২১৬2
একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রোগ্রাম অফিসার হিসাবে কাজ করার সময় বিষয়টি নজরে আসে ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা নীলকান্ত মিশ্রের। তার পর তিনি মৎস্যজীবীদের উন্নতমানের চাষের ব্যাপারে অবহিত করার কাজ শুরু করেন। প্রতিষ্ঠা করেন একটি অসরকারি সংস্থা। তাঁর সেই সংস্থার হাত ধরে প্রায় ছ’টি রাজ্যের ২৫ হাজারেরও বেশি মৎস্যজীবীর জীবনে এসেছে পরিবর্তন। কেমন করে এত মৎস্যজীবীর জীবন পাল্টে দিলেন তিনি?
৩১৬3
নীলকান্তের জন্ম ঝাড়খণ্ডের শিল্পশহর জামশেদপুরে। সংখ্যাতত্ত্বের প্রতি আকর্ষণে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক হন তিনি। গ্র্যাজুয়েশনের সময় থেকেই সমাজসেবার প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মায়। সেই আগ্রহ থেকেই রাঁচীর জেভিয়ার্স ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সার্ভিস থেকে গ্রামীণ উন্নয়নের উপর স্নাতকোত্তর কোর্স করেন।
৪১৬4
২০০০-এ সেই কোর্স শেষ হওয়ার পর তিনি জামশেদপুরে ফ্রি লিগাল এইড কমিটিতে যোগ দেন। সেখানে ডাইনি সন্দেহে নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ার কাজ করেন। তাঁর মতো মানুষের নিরলস প্রচেষ্টার পরই ঝাড়খণ্ড সরকার উইচক্রাফ্ট প্রিভেনশন অ্যাক্ট চালু করে। এর পর কয়েক বছর আদিবাসীদের অধিকার, শিশু অধিকার, মানবাধিকার এর মতো বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করেন।
৫১৬5
কিন্তু নীলকান্তের জীবনে টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায় একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার লখনউ অফিসে প্রোগ্রাম অফিসার হিসাবে যোগ দেওয়ার পর। সেখানেই প্রথম মৎস্যজীবীদের নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। মধ্যপ্রদেশের বুন্দেলখণ্ডে মৎস্যজীবীদের জীবনযাত্রার উন্নতি নিয়ে কাজ করতে থাকেন তিনি।
৬১৬6
সেখানে গিয়ে তিনি দেখেন, বাজার থেকে চাষের সরঞ্জাম, মাছের খাবার কিনে চাষ করে মৎস্যজীবীদের বিশাল খরচ হয়ে যাচ্ছে। সেই খরচের চোটে চাষ করার পর তেমন লাভ থাকে না তাঁদের। তাই প্রোডাকশনের খরচ কমিয়ে চাষের ব্যাপারে কী ভাবে মৎস্যজীবীদের স্বনির্ভরতার পথ দেখাতে থাকেন। মৎস্যজীবীদের ইন্টিগ্রেশন ফার্মিংয়ের ব্যাপারে বোঝাতে থাকেন।
৭১৬7
তিনি দেখেন। মাছ ধরার জন্য উপযুক্ত খাঁচার দাম বাজারে অনেক। গরিব মৎস্যজীবীদের পক্ষে তা কেনা সম্ভব নয়। তখন স্থানীয়দের দিয়েই বাঁশ, কাঠ, জাল দিয়ে তৈরি করেন সেই খাঁচা। এ রকম মাছের খাবারেও বিকল্প আনেন তিনি।
৮১৬8
তাঁর দেখানো পথে মৎস্যজীবীদের দিয়েই তৈরি করতে থাকেন মাছের খাবার। পাশাপাশি কোন আবহাওয়ায় কী ভাবের মাছের পরিচর্যা করতে হবে, সেই সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক পাঠও দিতে থাকেন তাঁদের।
৯১৬9
এ ভাবে চলতে চলতে সেই এলাকার মৎস্যজীবীদের চাষের ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। চাষের বিভিন্ন ম্যানেজমেন্টের কাজে মৎস্যজীবীরাও সচেতন হয়। সেখানকার এক মৎস্যজীবী জানিয়েছেন, ২০০৪ থেকে বাড়ির পুকুরে চাষ করেও তেমন সাফল্য পাচ্ছিলেন না তিনি। কিন্তু নীলকণ্ঠের দেখানো পথে সাফল্য পেয়েছেন তিনি।
১০১৬10
বুন্দেলখণ্ডের এই মডেলে সাফল্য পেয়ে নীলকণ্ঠ অন্যান্য রাজ্যের মৎস্যজীবীদের মধ্যে তা ছড়ানোর কথা ভাবতে থাকেন। ওড়িশা, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সাহায্যে সেখানকার মৎস্যজীবীদের এই পদ্ধতিতে চাষের ব্যাপারে উৎসাহিত করার চেষ্টা করেন।
১১১৬11
কিন্তু সেই কাজে আশানুরূপ সাফল্য আসছিল না। তখন তিনি নিজের সংস্থা খোলার কথা ভাবতে শুরু করেন।
১২১৬12
সেই মতো ২০১৩ সালে নিজের সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। নিজের সংস্থার মাধ্যমে তিনি পৌঁছনোর চেষ্টা করেন বিভিন্ন রাজ্যের মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের কাছে। তাঁদের দিতে থাকেন স্বনির্ভরতার পাঠ।
১৩১৬13
এ ব্যাপারে নীলকণ্ঠ বলেছেন, ‘‘মাছের খাবার বানানো, চারার সঠিক যত্ন নেওয়ার ব্যাপারে অধিকাংশেরই স্বচ্ছ ধারণা ছিল না। আমরা শিখিয়েছি কৃষির বর্জ্যকে কাজে লাগিয়ে মাছের খাবার তৈরি করা। মাছের খাবারে বিভিন্ন খাদ্য উপাদানের হাক সঠিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। এ ছা়ড়াও চাষের ব্যাপারে ছোট ছোট কিছু পদক্ষেপ বিশাল ফারাক গড়ে দিয়েছে মৎস্যজীবীদের জীবনে।’’
১৪১৬14
এই পদ্ধতিতে চাষের কাজে সামিল হন মহিলারাও। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা তাঁর সংস্থার সঙ্গে যুক্ত করেন নিজেদের।
১৫১৬15
নীলকণ্ঠ বলেছেন, ‘‘মহারাষ্ট্র রুরাল লাইভহুড মিশনের অধীনে বিভিন্ন এলাকার স্বনির্ভর গোষ্ঠীর প্রায়। ১০০ জন মহিলা আমাদের কাছে এই চাষের ব্যাপারে প্রশিক্ষণ নেন। তার পর তাঁরাও যোগ দেন সেই কাজে। এ ভাবে ৬০০-র বেশি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর চার হাজারেরও বেশি মহিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে এ ভাবে মৎস্যচাষের কাজে নিজেদের নিয়োজিত করেছেন।’’
১৬১৬16
এ ভাবে তাঁর সংস্থার দ্বারা মৎস্যচাষের প্রশিক্ষণ নিয়েছেন ২৫ হাজারেরও বেশি জন। এই কাজে সাফল্যের জন্য স্বীকৃতিও পেয়েছেন নীলকণ্ঠ। ২০১৭তে অশোকা ফেলোর জন্য মনোনীত হন। তাঁর প্রতিষ্ঠান আউটলুক প্রস্থান পুরস্কার পায় ২০১৯-এ। রাষ্ট্রপুঞ্জের ইকিউয়েটর পুরস্কারও পেয়েছে তাঁর সংস্থা

No comments:

Post a Comment