Tuesday, May 5, 2020

সংক্রমিতদের আলাদা করাই বড় চ্যালেঞ্জ






করোনার সামাজিক বিস্তারে এখন উপসর্গহীন অনেক রোগী পাওয়া যাচ্ছে। তাদের মধ্যে ন্যূনতম জ্বর, কাশি, সর্দি কিংবা কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না। আর বড় একটি অংশ উপসর্গ নিয়েও তা লুকাচ্ছেন, পরীক্ষার ব্যাপারে তাদের আগ্রহের চেয়ে অনীহাই বেশি। এ ধরনের সংক্রমিতদের চিহ্নিত করে আইসোলেশনে নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, র‌্যাপিড অ্যান্টিবডি টেস্টের মাধ্যমে আক্রান্তদের আইসোলেশনে নিতে হবে।
বাংলাদেশে এখন প্রতিদিনই করোনার সংক্রমণ বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক দিনের মধ্যে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিনই হাজার ছাড়াবে। এর ফলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা যে অবস্থায় আছে তার আরও করুণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। এমন কঠিন বাস্তবতার মধ্যেই গার্মেন্ট কারখানা খুলে দেওয়ার সপ্তাহখানেকের মাথায় ঈদকে সামনে রেখে শপিংমলগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত এসেছে। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরকারের শীর্ষ মহলও বিব্রত। কিন্তু দেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে এবং মানুষের জীবিকার তাগিদে তাদের কাছে এর বিকল্প নেই বলে জানিয়েছেন সরকারের দায়িত্বশীলরা।
সম্প্রতি রাজধানীর খিলগাঁওয়ের ষাটোর্ধ্ব এক মহিলা অসুস্থ বোধ করায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। কিন্তু বয়স বিবেচনা করে চিকিৎসকরা তার করোনা পরীক্ষা
করলে পজিটিভ আসে। অথচ তার করোনার কোনো লক্ষণই ছিল না। গেল সপ্তাহে ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলায় ঢাকা থেকে বাড়ি যাওয়া এক নারীর করোনা পরীক্ষা করে তার পজিটিভ পাওয়া যায়। এলাকাবাসীর অনুরোধে তার করোনা পরীক্ষা করা হলেও তার শরীরের কোনো লক্ষণ ছিল না। দুই সপ্তাহ ধরে এমন অনেক রোগী পাওয়া গেছে, যাদের কোনো লক্ষণই নেই। বিষয়টি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যারা উপসর্গহীন তারাই অন্য মানুষকে বেশি সংক্রমতি করছেন। কারণ ওই ব্যক্তি জানেনই না, তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। যার কারণে তিনি স্বাভাবিক জীনব-যাপন করছেন, অফিস যাচ্ছেন, বাজার সদাই করছেন। এতে প্রচুর ব্যক্তি তার দ্বারা সংক্রমিত হচ্ছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা গতকাল মঙ্গলবার বিকালে আমাদের সময়কে বলেন, আক্রান্তদের সংস্পর্শে এসেছেন এমন ব্যক্তিদের পরীক্ষা করে উপসর্গহীন ২৩ শতাংশের করোনা পেয়েছেন তারা।
এ অবস্থায় কীভাবে সংক্রমিতদের আলাদা করা যায় জানতে চাইলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক আমাদের সময়কে বলেন, টেস্ট, টেস্ট এবং টেস্ট। এর বিকল্প নেই। পরীক্ষা করেই জানতে হবে কারা আক্রান্ত। টেস্টের আওতা ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তাদের সঠিক নিয়ম মেনে আইসোলেশনে নিতে হবে। আইসোলেশনে থাকা অবস্থায় কারও উপসর্গ তীব্র হলে তখন তাকে হাসপাতালে নিতে হবে। সংক্রমিতদের চিহ্নিত করে সুস্থদের চেয়ে আলাদা করাই একমাত্র উপায়। এ জন্য র‌্যাপিড অ্যান্টিবডি টেস্ট করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম মেনে আমাদের লকডাউন তোলা হচ্ছে না। গার্মেন্টস খুলে একটি ভুলে করেছি, দোকানপাট খুলে আবার ভুল করছি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বুলেটিন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতিদিনই আক্রান্তের সংখ্যায় রেকর্ড হচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবারও রেকর্ড ৭৮৬ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন।
প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, বাংলাদেশে বড় ধরনের পরীক্ষা করা হয়নি। ফলে সুস্পষ্টভাবে বলা যাবে না কত শতাংশ উপসর্গহীন আক্রান্ত রয়েছেন। ভারতের একটি গবেষণায় দেখা গেছে সেখানে ৮০ ভাগ রোগী উপসর্গহীন। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের পরিবেশগত, ইকোলজিক্যাল ও জনগঠনের সামঞ্জস্য রয়েছে। সে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে আমাদের উপসর্গহীন রোগীর সংখ্যা ভারতের মতোই হবে বলে ধারণা করা যায়। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে অ্যান্টিজেন ও অ্যান্টিবডি কিংবা র‌্যাপিড অ্যান্টিবডি টেস্ট করতে হবে। সারাদেশের ২০০ থেকে ৩০০টি স্থানে ব্যাপকহারে এ ধরনের পরীক্ষায় বোঝা যায় আমাদের করোনা রোগীর প্রকৃত সংখ্যা কত। কিন্তু স্বাস্থ্য প্রশাসন সেই পথে হাঁটছে না। এ বিষয়ে তারা অতিরক্ষণশীল ভূমিকা পালন করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশই আক্রান্তদের একটি নির্দিষ্ট গ-িতে রাখতে ‘ক্লাস্টার নিয়ন্ত্রণ’ নীতি গ্রহণ করেছে। সংক্রমণের শৃঙ্খল ভাঙতে একযোগে বিভিন্ন ‘হটস্পটে’ কাজ করছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ কাজটা যথাযথভাবে করা হচ্ছে না। ফলে সংক্রমণের হার বেড়েই চলেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে এখন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর সবচেয়ে করোনা সংক্রমিত জেলা ও হটস্পট। অথচ এই জেলাগুলোয় সংক্রমণ ঠেকাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা যথেষ্ট নয়। আবার প্রশাসনের কাজে সমন্বয়হীনতা সংক্রমিতদের আলাদা করা তো দূরে থাক সংক্রমণ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
গত দুই সপ্তাহে নারায়ণগঞ্জ থেকে তাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে বেশকিছু পোশাক শ্রমিক করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। কিন্তু তারা যাওয়ার পথে অনেক মানুষকে সংক্রমিত করে। এসব মৃত ব্যক্তি লকডাউনের মধ্যেই করোনা উপসর্গ থাকার তথ্য লুকিয়েই বাড়ি ফেরে। সাভারের এক পোশাক শ্রমিক করোনার উপসর্গ নিয়েই গত মাসের শুরুর দিকে ৩ দিন ধরে সাইকেল চালিয়ে তার বরগুনা গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে। পরে প্রশাসন তার করোনা পরীক্ষায় পজিটিভ পায়। কিন্তু পথে পথে এই পোশাক শ্রমিক অনেককেই সংক্রমিত করেছে। প্রশাসন এই সংক্রমিতদের আলাদা করতে পারেনি। একজন থেকে আরেক জনে করোনার সংক্রমণ ঘটেছে।

No comments:

Post a Comment