অফুরন্ত ছুটির অজানা ভবিষ্যৎ
করোনাভাইরাস
পাল্টে দিয়েছে আমাদের জীবনের বাস্তবতা। দেশ–বিদেশের পাঠকেরা এখানে লিখছেন
তাঁদের এ সময়ের আনন্দ–বেদনাভরা দিনযাপনের মানবিক কাহিনি। আপনিও লিখুন।
পাঠকের আরও লেখা দেখুন প্রথম আলো অনলাইনে। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: dp@prothomalo.com
অলংকরণ : প্রথম আলোব্যস্ততম
প্রাণোচ্ছল শহর ঢাকা আজ যেন প্রাণহীন। নেই গাড়ির হর্নের আওয়াজ, রিকশার
বেলের টুংটাং আওয়াজ। এমনকি খালি পড়ে আছে মানুষে গিজগিজ করা রাস্তাগুলো,
ফুটওভারব্রিজগুলো। জনশূন্য রাস্তাগুলোই এখন মিস করছে আমাদের।এই তো দেড় মাস আগেই স্কুল, কোচিংয়ের চাপে যখন আমি মনে মনে বলছি, আহ! সপ্তাহে যদি একটা দিন শুধু বাসায় বসে গল্প–উপন্যাস পড়তে পারতাম কিংবা মন খুলে গান গাইতে বা শুনতে পারতাম, কী মজাটাই না হতো। কিন্তু হায়! কী ভাগ্য আমার, এখন সপ্তাহের প্রতিদিনই নির্দিষ্ট কাজগুলো সম্পন্ন করার পরও রয়ে যায় অফুরন্ত সময় আর সারা সপ্তাহই কাটে একঘেয়েমিতে।
প্রতিবছরই ক্যালেন্ডারে ছুটির তারিখগুলো গুনে মনে হতো, ইশ্ আরেকটু বেশি দিন ছুটি হলে ভালো হতো। এ বছর তো ক্যালেন্ডার দেখে প্রথমেই মন খারাপ হলো। কার,ণ স্কুল থেকে দেওয়া বিভিন্ন ছুটির দিনগুলো যে এবার শুক্র ও শনিবারের মধ্যে পড়েছে। ফলে স্কুলও কম বন্ধ থাকবে।
কিন্তু করোনাভাইরাস এসে ছুটি এতটাই বাড়িয়ে দিল যে ছুটি যেন এখন এক অভিশাপ। এ রকম ছুটি আগে কখনো পাইনি। তবে এই ধরনের ছুটি পাওয়ার থেকে না পাওয়া আরও ভালো। কী কষ্ট! সারা দিন বাসায় থাকতে হচ্ছে। দরজার বাইরে এক পা রাখলেও মা ছুটে এসে ঘরে ঢুকতে বলছে। আগে দুপুরে একটু ঘুমানোর জন্য মনটা উসখুস করত। কিন্তু কোচিংয়ের জন্য ঘুমানো তো দূর, সন্ধ্যা পর্যন্ত বাইরেই থাকতে হতো। আর এখন পেরিয়ে যাচ্ছে অগণিত দুপুর। কিন্তু ঘুম আসতে চায় না এই দুপুরে। শুধু মনে হয়, কবে যাবে করোনাভাইরাস, কবে আমরা স্বাভাবিক দৈনন্দিন জীবনে ফিরতে পারব, কবে যেতে পারব স্কুল, কোচিং কিংবা দাঁড়াতে পারব খোলা আকাশের নিচে।
প্রথম দিকে যখন শুনেছি মার্চের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিল ও মে মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত গৃহবন্দী থাকতে হবে, তখন মন অত্যন্ত খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আবার পরে যখন শুনলাম যে করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকতে পারে, তখন এক মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল, আমি একজন আসামি, যাকে একটি কক্ষে সম্পূর্ণরূপে বন্দী করে রাখা হয়েছে। মনে হচ্ছিল মানবজাতি এক অন্তহীন সুড়ঙ্গে পড়ে গেছে, যেখান থেকে বের হওয়ার পথ কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছে না। করোনাভাইরাস আসলেই এক অন্তহীন সুড়ঙ্গ, যার শুধুই আছে অজানা, অনিশ্চিত এক ভবিষ্যৎ।
এই বর্তমান সময়ে নিজেকে জেলে বন্দী বলে মনে হচ্ছে। পরক্ষণেই আবার মনে হচ্ছে, আমি তো জেলে বন্দী হয়ে খেতে পারছি, ঘুমাতে পারছি। কিন্তু কিছু মানুষ আছে যারা ঘুমানো তো দূরের কথা, ঠিকমতো খেতেও পারছে না। এমনকি না খেয়েও দিন কাটিয়ে দিচ্ছে বহু মানুষ। প্রতিদিনই পত্রিকায় অসহায়, দুস্থ মানুষের ছবিতে দেখে মনে হয়, ইশ্! সব মানুষ যদি সমানভাবে অন্তত মৌলিক অধিকারগুলো পেত। আরও হৃদয়বিদারক হলো কাক, কুকুর, বিভিন্ন পাখির ডাক। তারা ক্রমাগত ডেকে চলেছে। তাদেরও অসহায় অবস্থা, খাবার নেই। এই অবলা প্রাণীগুলো যখন ডাকতে থাকে, তখন মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে বলি একটু সদয় হওয়ার জন্য। মাঝেমধ্যে মনে হয়, নিজে গিয়েই এই অবলা প্রাণীগুলোকে খাবার দিই। কিন্তু সেই ইচ্ছা মনেই থেকে যায়। কারণ, বাসা থেকে বের হওয়া যে বারণ। চাইলেও করোনা যেমন চলে যাচ্ছে না, তেমনি চাইলেও বাসার বাইরে ভাইরাসের ভয়ে পা রাখা যাচ্ছে না।
করোনাভাইরাসের আতঙ্ক তো রয়েছেই, এর মধ্যে যে বিষয়টি মনকে গভীরভাবে বিষাদগ্রস্ত করে তুলল তা হলো জাতীয় অধ্যাপক স্যার জামিলুর রেজা চৌধুরীর মৃত্যু। একদিকে করোনাভাইরাসের প্রভাব বেড়ে চলেছে ক্রমাগত, বাংলাদেশ তথা বিশ্বের অন্যদিকে দেশের শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তির মৃত্যু মনকে হতাশাগ্রস্ত করে তুলছে। মনে হচ্ছে ২০২০ সাল যেন মানবজাতির জন্য অভিশাপ স্বরূপ। এই ২০২০ সাল যদি না থাকত, তবেই বেশ হতো।
এখন শুধুই মনে হয়, মানবজাতির জন্য কবে সত্যি হবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই গানের লাইন
‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর’।
আবকারী আজম
দশম শ্রেণি (ভিকারুননিসা নূন স্কুল)
মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

No comments:
Post a Comment